একটি ভ্রুনহত্যার গল্প

আমি আজকাল প্রায় সকালেই দেরী করে ঘুম থেকে উঠিআজও দিবানিদ্রাতেই থাকার প্রাণপন প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলামকিন্তু ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো নোকিয়া ফোনের কড়কড় রিংটোনেসাধারণত এরকম ক্ষেত্রে আমি ঘুমের ভান করে পরে থাকিকিন্তু আজকের ঘটনা ভিন্নকারণ ফোনটা করেছে মুনিয়া খালাআমাকে যদি আমার দেখা পৃথিবীর দশজন ভালো মানুষের তালিকা করতে বলা হয় তাহলে আমি উনাকে এই তালিকাতে রাখতে পারবোনাআমার কাছে উনি কারো সাথেই তুলনীয় ননখালা আমাকে এতটাই ভালোবাসেন যে আম্মা মাঝে মাঝে উনাকে বলেন,”মুনিয়া আমার ছেলেরে তুই নিয়ে যা,তোকে আমি দিয়ে দিলাম” মজার ব্যাপার হলো উনি আমার আপন খালা নাবিভিন্ন লতায়-পাতায় পেঁচানো খালাপ্রকৃতির কি অদ্ভুত লীলা যার মনটা এত মায়া দিয়ে গাঁথা,তাকেই খোদা কখনো নিজের সন্তানের মা ডাক শুনতে দেননিখালার প্রথম সন্তান মারা যাওয়ার পর কি কারণে যেন উনি আর কখনোই মা হতে পারেননিখালার সেই সন্তানটি ছিলো ছেলে,যে পৃথিবীতে আসার পূর্বে নাম প্রাপ্ত হয়েছিলো অর্কএর কিছুদিন পর আমার জন্ম হলে এই খালাই আমাকে তার সন্তানের জন্য রাখা নামটি দেনশুনেছি জন্মের পর মুনিয়া খালা আমাকে নিয়ে যান কিনা এটা ভেবে আম্মা বেশ ভয়ে ছিলেনহয়তো তার হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে আমার মাঝে খুঁজে পান বলেই প্রতিবার বাসা থেকে বিদায় নেওয়ার আগে ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন,”আব্বা গেলাম,তুমি ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া কইরোপড়াশোনা বাদ

আসল কথায় ফিরে আসিআমি খালার ফোন ধরে সালাম দিতেই খালা কান্না কান্না কন্ঠে আমাকে অনেকগুলো কথা একসাথে বলতে লাগলেনঅস্পষ্টভাবে যা বললেন তাতে আমি যা বুঝলাম তা হলো,রিমি হাসপাতালেআজকে ওর abortion করা হয়েছেসমস্যা হয়েছে ওর জ্ঞান এখনো ফেরেনি

রিমির পরিচয় দেয়া দরকাররিমি আমার খালার পালিত কন্যাওকে দত্তক নেয়ার ঘটনাটা খুবই বিচিত্রখালার সন্তান মারা যাওয়ার পর খালা একটু কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলেনতখন ঘরের কাজের জন্য একজন বুয়া রাখা হয়বুয়ার মাসখানেক আগে একটা মেয়ে হয়েছিলোখালা বুয়ার বাচ্চাকে নিজের খাটে শুইয়ে ঘুম পাড়াতেন,কোলে নিয়ে রাখতেন,এমনকি খাইয়েও দিতেনখালু এই ব্যাপার নিয়ে মহা পেরেশান ছিলেনআমার আম্মাকে প্রায় বলতেন “আপা বুয়ার বাচ্চার জন্য আমি আজকাল ঘুমাইতে পারিনা,আমাকে আপনার বোন সোফায় ঘুমাইতে বলে নিজে বাচ্চারে আমাদের খাটে রেখে দেয়বলেনতো এইটা কিছু হইলো?”

দুঃখজনকভাবে বুয়া কাজ করার দুইমাস পরে তার শরীরে লিউকিমিয়া ধরা পড়েখালা শুধু বুয়ার কন্যাসন্তানটির জন্য হলেও বুয়ার অনেক চিকিৎসা করিয়েছিলেনকিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি মৃত্যুর কয়েকঘন্টা আগে হঠাৎ করে বুয়া খুব হাসতে শুরু করেএকসময় খালার হাত ধরে বলে,”আপনে কিন্তু ওর মা আছেন,আপনারে কীরা দিয়া গেলাম” আমার মমতাময়ী খালা এভাবেই রিমিকে পান রিমি আর আমার বয়স প্রায় সমানখুব বেশি হলে বছরখানেক ছোট হবেওর আপন মা মারা যাওয়ার পর খালা কখনো ওকে এতটুকু কষ্ট দিয়ে মানুষ করেননিআমরা এবং খালার আত্নীয়স্বজনদেরকে খালা প্রথমেই বলে দিয়েছিলেন,উনাকে যদি কেউ আপন মনে করে তাহলে এই বাচ্চাকেও আপন ভেবে নিতে হবেএকবার আমার এক মামা কিছু একটা বলেছিলেন,মুনিয়া খালা চোখের পানি নাকের পানি এক করে তাকে ত্যাজ্য করেনওই মামা পরে রিমির জন্য ১০ কেজি চমচম কিনে খালার বাসায় রওনা হোনখালা তো তার দরজা খুলেননা কোনভাবেইপরে খালুজান অনেক কষ্টে খালাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মামার সাথে ভাব করায় দেনখালা শর্ত দিছিলেন,মামা যেন তার বাসায় কখনো মিষ্টি ছাড়া না আসেআমরাও মামার বদৌলতে প্রায়ই চমচম খেয়ে তৃপ্তিভরা ঢেঁকুর তুলতামউল্লেখ্য রিমির প্রিয় খাবার ছিলো চমচম

সবই ঠিক ছিলো,শুধু সমস্যা ছিলো খালুজানখালা মনে করতেন খালুজান রিমিকে আপন মেয়ের মত ভালোবাসেননাযদিও রিমি কখনো অভিযোগ করেনি,বরং খালুর সাথে দেখতাম তার বেশ ভালোই ভাবখালু তার এই পালক কন্যাকে কখনো একবারের জন্যও সামান্য ধমক দেয়নিতবুও খালা রিমিকে নিয়ে খালুজানকে প্রায়ই বকাঝকা করতেন

সেই রিমির চার মাস আগে আকদ হয়ে গেছে আর আজকে কি ভয়ঙ্কর কথা শুনলামআমি খালাকে হাসপাতালের নাম জেনে এখুনি আসছি কথা দিয়ে ফোন রাখলামএর এক ঘন্টা পর আমি মনোয়ারা হাসপাতালে রিমির কেবিনের পাশের খোলা বারান্দায় দাঁড়ানোআমার পাশে রিমির জামাই মুখ কাঁচুমাঁচু করে বসে আছেআমি তাকে মুখ গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করলাম, abortion এর সিদ্ধান্ত কেন নিলো! উনি আমার দিকে অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে বললো, “এখনো তো ঘরে তুলে নেইনিআম্মা বলছে অনুষ্ঠান করে বউ ঘরে নেবেনতাই অনুষ্ঠানের আগে বাচ্চা হয়ে গেলে সমস্যাএইজন্যই আর কি…”আমি এহেন জবাব শুনে হতভম্ব হয়ে গেলামতার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেও আর ইচ্ছা হলোনাখালা আর খালুর পাশে যেয়ে দাঁড়ালাম খালা তখন অঝোরে কাঁদছে মেয়ের পাশে বসেখালু খালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন চুপ করেআমাকে দেখে খালা কাছে টেনে এনে বসালেনতারপর কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, “তোমার খালুজানরে জিজ্ঞেস করো সে কেন কিছু করলোনাএখন আমার সাথে আহলাদ দেখায় বলে মেয়ের কিছু হবেনাকোনদিন এই লোক মেয়েটাকে নিজের মেয়ে ভাবেনাই” খালু আস্তে আস্তে মাথা নাড়ায় বলে, “আমি কি করবো?তোমার মেয়ের জামাই এমন সিদ্ধান্ত নিলে ওদের মধ্যে আমি কি কিছু বলার হক রাখি?” খালা এবার রেগে গেলো, “তুমি আমার সামনে থেকে দূর হওতোমার মুখ দেখাও পাপ” খালু আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষন,তারপর কেবিনের বাহিরে হাঁটা দিলোখালা আমাকে এরপর জিজ্ঞেস করলো,নাস্তা করছি নাকিহালকা পাতলা কথা বললো

এর একটু পর রিমির প্রথমবারের মত সেদিন জ্ঞান ফিরলোখালা হন্তদন্ত হয়ে রিমির মাথার কাছে যেয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, “মা এখন কেমন লাগতেছে?ব্যাথা আছে?” রিমি একটা কেমন অসহ্য যন্ত্রনা নিয়ে খালার দিকে তাকালোতারপর খেব মৃদু কন্ঠে বললো, “আম্মু ভাইয়াকে অনেকদিন পর দেখলামও তো বোনের কথা একবারও ভাবেনা” আমি রিমির দিকে হাসি দিয়ে তাকিয়ে বললাম, “সময় পাইনারেবাসাতেও আজকাল থাকিনা তেমন” রিমির চোখ দিয়ে দেখলাম টপ টপ করে পানি পড়ছেআমাকে কান্না কান্না গলায় বললো, “ভাইয়া জানিস ডাক্তার না মানা করছিলো বাচ্চাটাকে না মারতে,আমি সকালে আসলে ডাক্তার আমাকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করে দেখায় আমার বাচ্চার ছোট্ট মুখখানা,তার হৃদপিন্ডের ধুক ধুক শুনায়জানিস ভাইয়া অনেক ছোট্ট ছোট্ট হাত ছিলোএমন কেন হলো রে?আমার বাচ্চাটা কি কোনদিন আমাকে মাফ করবেরে ভাইয়া?আমি অনেক কাঁদছিলাম যেন বাচ্চাটাকে না মারে,কিন্তু আমার কথা কেউ শুনেনাইভাইয়া আমার বাচ্চাটা এখন কই আছে বলতো?বেহেশতে না ভাইয়া?”

আমি চোখের পানি ঢাকার জন্য কেবিনের বাহিরে চলে আসিপিছনে শুনলাম খালা অঝোরে কাঁদছেবাহিরে এসে শার্টের কোনা দিয়ে চোখ মুছে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণএকটু স্বাভাবিক হলে পিছন ফিরে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলামআমার খালুজান হাসপাতালের করিডোরের আরেক পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছেআমি উনার কাছে আস্তে আস্তে হেঁটে গেলামদেখলাম উনি রিমির আসল বাবা ফরিদ উদ্দিন সাহেবের কাঁধে হাত দিয়ে কান্নাভেজা চোখে এক গাদা কথা বলছেন “বুঝলা ফরিদ আমার মেয়েটাকে যখন স্কুল থেকে নিয়ে আসতাম তখন প্রায় সে মিস্টির দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকতোপ্রতিদিন আমরা মিস্টির দোকানে যেয়ে একসাথে চমচম খেতামওর জন্য প্রতিরাতে চমচম কিনে আনতামওর মা ঘুমায় থাকতো,তখন আমি ওকে কোলে করে নিয়ে বারান্দায় ঘুরতাম আর মিস্টি ভেঙ্গে ভেঙ্গে মুখে দিতামও আমার কোলেই খেতে খেতে ঘুমায় পড়তোআজকে আমার এই মামুনীটা এভাবে হাসপাতালে শুয়ে আছে আর আমি ওর জন্য কিছু করতে পারছিনা” ফরিদ সাহেব মাথা নিচু করে খালুজানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিইয়ে বললো, “কাইন্দেন নাআমাগো মাইয়ার কিছু হইবোনা

আমি এই দুই অশ্রসজল পিতার ভালোবাসার দৃশ্য কিছুক্ষণ দেখলামকিছু সময় মানুষ অনুভূতিহীন হয়ে যায়আমারো ঠিক এই মুহূর্তে এমনটাই মনে হচ্ছিলোকত কথা মনে পড়ে গেলোআমার এস.এস.সি,এইচ.এস.সি পরীক্ষার সময় রিমি প্রতিদিন বাসায় এসে এটা-ওটা রান্না করতোআমাকে বলতো, “আমার ভাইয়া হলো সবসময় ফাস্টতাই এখন পরীক্ষার জন্য ওর খাবারও হবে ফাস্টক্লাস” আমি এসব ভাবতে ভাবতে মনে মনে বললাম , “বোনরে আমি কোনদিন ফাস্ট হইতে পারিনাইকিন্তু তুই সবসময় বোন হিসেবে আমার কাছে ফাস্ট ছিলি”

আরেকবার চোখে পানি মুছতে মুছতে খালার চিৎকার শুনতে পারলামআমি হুড়মুড় করে কেবিনের দিকে দৌড় দিলামদেখি রিমির শরীর কেমন কুঁকড়িয়ে যাচ্ছেহতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলামডাক্তার ডেকে আনা হলোরিমির জামাই আফসার সাহেব ছুটাছুটি করতে থাকলেনডাক্তার সবাইকে রুম থেকে বাহিরে যেতে বললে আমরা কেবিনের বাহিরে জমায়েত হলামআমার খালা অঝোর ধারায় তখন কাঁদছে “আমার মেয়েটার এমন সর্বনাশ হয়ে গেলো আমরা কিচ্ছু করতে পারলাম নাকেমন ছেলের কাছে বিয়ে দিলামআজকে বিয়ে বাঁচাতে মেয়েটাকে মনে হয় মেরেই ফেললাম“…খালার এইসব কথা শুনে রিমির জামাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলোআমি উনাকে যেয়ে দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলতে লাগলাম, “বউ বলে কি রিমির সাথে যা ইচ্ছা করার অনুমতি পায়া গেছেনওরে মানুষ মনে হয়না?নিজের বাচ্চারে এভাবে মারতে ঘৃনা হলোনা?” আমি এই কথা বলে সোজা হাসপাতালের বাহিরে চলে আসলামআমার কিচ্ছু তখন ভালো লাগছিলোনাকি অসহ্য এই মানব জীবনআমরা মানুষগুলো দিন দিন কেমন যেন অমানুষ হয়ে যাচ্ছিআজকে রিমির সাথে যা হয়েছে,সামাজিকতার দায়ে না জানি আর কত মেয়ের সাথে এমন হয়ে চলছে প্রতিদিন

রাত আটটার দিকে রিমির কেবিনে আমরা সবাইঅতিরিক্ত রক্তপাতের জন্য ওর অবস্থা তখন মুমূর্ষসেই সময় পান খেতে খেতে আবির্ভাব ঘটে রিমির শ্বাশুরীরউনি রিমির কপালে হাত দিয়ে বলেন, “এখুন কিমুন আছে মাইয়া?” খালা কটমট চোখে তাকিয়ে বলেন, “আমি যদি আগে জানতাম আপনারা আমার মেয়ের সাথে এই কাজ করবেন তাহলে…” রিমির শ্বাশুরী খালার দিকে তাকিয়ে চোখ কপালে তুলে বলেন, “আমি কি জানতাম আপনার বাসায় আমার পোলা যায়া থাকে?আর মাইয়া তো বড় হইছিলোতার বুদ্ধি থাকলেইতো পোয়াতি হওয়া লাগতোনাআমার পোলাটাও যে বেকুব এইটাও খাটি সত্য” রিমির আসল পিতা ফরিদ সাহেব মহিলার দিকে তাকিয়ে চোখ গরম করে বললো, “আমার স্যান্ডেলটা কিন্তু চামড়ার না প্লাস্টিকেরমুখে পড়লে দাগ যাইবোনাআমি যদি বুজতাম আগে,আমার মাইয়ারে বিয়া বইতে দিতামনাআপনার পোলারে থুতু দিয়া আসতাম” রিমির শ্বাশুরী এই কথার জন্য প্রস্তুত ছিলেন নাতিনি সাথে উঠে উঠে দাঁড়িয়ে গজগজ করতে করতে হাঁটা দিলেনপিছন থেকে তার ছেলে “আম্মা আম্মা” করে নপুংশকের মত হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে গেলো

রাত্রি নয়টায় রিমির জ্ঞান কিছুটা ফিরে আসেসে “আব্বু আব্বু” বলে ডাকা শুরু করেখালুজান রিমির খাটের পাশে বসে শক্ত করে ওর হাত ধরে আছেন যেন কেউ তার মেয়েকে তার থেকে কেঁড়ে নিতে না পারেরিমি খালুজানের আঙ্গুলগুলো আস্তে আস্তে দুর্বল ভাবে ধরে মৃদু কন্ঠে খালুকে আরো কাছে আসতে বললোওর দুর্বল গলার স্বর আমরা ঠিকই শুনতে পাচ্ছিলামকেমন যেন তীব্র হয়ে তা কানে বিঁধছে “আব্বু তুমি যে আমাকে মার থেকে বেশি ভালোবাসো এটা আমি কিন্তু জানিতোমার মনে আছে আমি যখন ছোট্ট কালে টাইফয়েড জ্বরে অজ্ঞান হয়ে ছিলাম,তখন তুমি সব কাজ রেখে সারাদিন আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরেছিলে?যে ভালোবাসা তুমি আর আম্মু আমাকে দিছো আমি হাজার জনমেও এর ঋণ শোধ করতে পারবোনাআমি মারা গেলে তুমি কিন্তু আম্মুর অনেক খেয়াল নিবাতুমি আর ভাইয়া ছাড়া আম্মুজানের কেউ নাইআর আব্বু আমার বাচ্চাটা খুব সুন্দর হইতো জানোওর তো বয়স দুই মাস হয়ে গেছিলোআমার মনে হতো,ও হালকা নড়াচড়াও করতোআমি ওর সাথে প্রতিদিন রাতে কত কথা বলছিগতরাতে ও আমাকে স্বপ্নে বলছিলো আম্মু আমার হার্ট ধুকধুক করেতুমি বেশি নড়াচড়া কইরোনা ঘুমের সময়

আমার খালাখালু অসহায় চোখে রিমির পাশে বসে তার কথা শুনছিলোরিমি শ্বাস টেনে টেনে এতগুলো কথা অনেক কষ্ট করে কিভাবে বললো জানিনাআমি নিজের চোখের পানি আটাকাতে পারছিলাম নাসবাই রিমিকে বলছিলো ও যেন চুপ করে থাকেওর কিচ্ছু হবেনাকিন্তু আমি জানতাম,অনেক আগেই জানতাম এই নোংরা পৃথিবী ওর জন্য না

আমার জানাটা মিথ্যা ছিলোনারাত তিনটায় রিমি মারা যায়দিনটি ছিলো ১৯শে অক্টোবর,২০০৮মারা যাওয়ার আগে সে শেষবার আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, “ভাইয়া আমার বাবুর কাছে যাচ্ছিরে” আমি এখনও রিমিকে অনেক মনে করিআমার বোনটা কোথায় আছে,কেমন আছে জানিনাকিন্তু আমি সবসময় প্রার্থনা করি যেন আমার সকল পুণ্য ও আর ওর অনাগত সন্তানটি পায়ওর স্বামীকে আমরা কখনো ক্ষমা করিনিঅবশ্য সেও রিমিকে কবর দেয়ার পর থেকে কখনো আর আমাদের সামনে মুখ দেখায়নিশুনেছি ভদ্রলোক(?) এখন সুইডেনে আছেআরেকটা বিয়ে যে করেছে এটা না বললেও চলে আর আমার মুনিয়া খালা সারাদিন তার বাসার বারান্দায় বসে থাকেনকারো সাথে তেমন কথা বলেননাশুধু আমি বাসায় গেলে আমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করেন,”তোরা সব এমন কেন?”এরপর কান্নাকাটি করেন অনেক, যা আমি সহ্য করতে পারিনা বলে নিজেই দুফোঁটা চোখের জল ফেলে বাসা থেকে বের হয়ে আসিপিছনে শুনতে পাই আমার খালু গম্ভীর কন্ঠে বলতে থাকেন, “কাইদোনা মুনিয়াআমার মেয়েটা কষ্ট পাবে”

[লিখায় বর্ণিত ভ্রুণহত্যার ঘটনাটি কল্পিত নয়নামগুলো আর কিছু চরিত্র পালটে দিয়েছিগল্পের রিমি মারা গেলেও বাস্তবের রিমি বেঁচে আছেকিন্তু যে মানসিক যাতনার সে স্বীকার হয়েছে তাকে বেঁচে থাকা বলে কিনা বলতে পারছিনাতার গুণধর স্বামীও তাই পার পেয়ে গেছেন এবং আপাতত ইউরোপে যাওয়ার জন্য ছোটাছুটি করছেনAbortion এর জন্য আমাদের দেশে অনেক মায়ের মৃত্যু ঘটনা অস্বাভাবিক নয়আমার জানামতে ব্যাপারটা খুবই কমনএই লেখাটা সেই মা আর তাদের অনাগত সন্তানের জন্যআরো বলে নিচ্ছি গল্পতে বর্ণিত অর্ক আমি নইঅর্ক সেই মানুষটি যার থেকে পুরো ব্যাপারটি জানা গেছেরিমি ও তার অনাগত সন্তানের জন্য সবাই আশা করি একবারের জন্য হলেও প্রার্থনা করবেনলেখার সময় আমার নিজের প্রতি বেশ ঘৃণাবোধ হয়েছেকারণ এই নোংরা সমাজের আমিও এক অংশ] ********************************************************************
সূত্র-আর্ক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s