ডিজিটাল আব্বা

> আজ আমি আপনাদের সাথে এক টা ডিজিটাল গপ্পো শেয়ার করুম।রেডী হইয়া লন।গপ্পো টা

> যারা

> পরে নাই তাদের জন্য।

>

> …………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………

>

> ডিজিটাল আব্বা – আনিসুল হক

>

> ডিপার্টমেন্টের হেডস্যার বললেন, 'নেক্সট সেমিস্টারে তোমার আর কন্টিনিউ করার

> দরকার

> নাই। তুমি অন্য কোথাও দেখো।'

>

> আমি বললাম, 'স্যার, আর কোথায় দেখব! এত ভালো একটা ইউনিভার্সিটি আমি ছাড়ব না।

> আর

> আপনার মতো টিচার! আমাকে লাস্ট চান্স দেন, স্যার।'

>

> 'গতবার আমি তোমাকে লাস্ট চান্স দিয়েছি। লাস্ট চান্স কয়বার হয়?' স্যারের

> মুখে মৃদু

> হাসি।

>

> 'এবিসি স্যার (মানে আবুল বাশার চৌধুরী) তো স্যার, আমাকে তিনবার লাস্ট চান্স

> দিয়েছেন।'

>

> হেডস্যার হাসলেন, 'তুমি টার্ম ফি দাও নাই। অ্যাবসেন্ট ছিলা প্রায় সব দিন।

> ফাইন দিয়ে

> এডমিশন নেওয়ার ডেটও পার হয়ে গেছে।'

>

> 'ব্যাক ডেটে নেন, স্যার।'

>

> 'তুমি এক কাজ করো। তোমার আব্বাকে ডেকে আনো। উনি এসে যদি বন্ড দেন, তাহলেই

> তোমাকে

> আমরা পরের সেমিস্টারে অ্যালাউ করব। যাও।' স্যারের হাসি মিলিয়ে গেল। তাঁর

> মুখটা কঠিন

> মনে হচ্ছে। আমি ঘামছি। অথচ স্যারের রুমে এয়ারকন্ডিশনার। মাথার ওপরে ফ্যানও

> ঘুরছে।

>

> আব্বা আসলে নিয়মিত টাকা দিয়েছেন। টার্ম ফি, সেশন ফি। আমি সেসব ভার্সিটিতে

> জমা

> দিইনি। এখন আব্বাকে কীভাবে বলব, আপনাকে স্যারের সঙ্গে দেখা করতে হবে। এটা

> অসম্ভব।

> এর আগে আব্বা আমার কাছে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ চেয়েছেন। সেটা বানিয়েছি। রসিদ

> বানানো

> খুব সোজা। কম্পিউটারে বানিয়ে লাল-হলুদ কাগজে প্রিন্ট নিলেই হলো। পরীক্ষার

> প্রগ্রেসিভ রিপোর্ট চেয়েছেন। সেটাও বানিয়ে নিয়ে গেছি। আব্বা জানে আমার ফিফথ

> সেমিস্টার চলছে। আসলে আমার অবস্থা খুবই খারাপ। থার্ড সেমিস্টার পার হতে

> পারছি না।

>

> আচ্ছা, এত কিছু যখন নকল করতে পেরেছি, একটা আব্বাও নকল করতে পারব। আমাদের

> বন্ধুদের

> মধ্যে আছে মোস্তফা কামাল, তাকে দেখতে লাগে বাবা-বাবা। সে একটা গ্রুপ

> থিয়েটারে নাটক

> করার চেষ্টা করছে। কাজেই সে পেশাদার অভিনেতা। আপাতত আমার আব্বার চরিত্রে

> তাকে অভিনয়

> করতে হবে।

>

> কামালকে নিয়ে গেলাম স্যারের কাছে। 'স্যার, আব্বা এসেছেন, স্যার।'

>

> 'আপনার ছেলে যে ক্লাস করে না আপনি জানেন?' স্যার বললেন।

>

> মোস্তফা কামাল বিব্রত হওয়ার ভঙ্গি করে বলল, 'হারামজাদা! তুমি বাপের নাম

> ডুবাবা।

> ক্লাস করো না, রোজ বাইর হও সাইজা-গুইজা, কই যাও?'

>

> আমি বলি, 'আব্বা, গালি দিচ্ছেন কেন? এটা আমার ভার্সিটি, উনি আমাদের

> হেডস্যার।

> ভদ্রতা বজায় রাখেন।'

>

> 'হারামজাদা, তোকে আজ মাইরাই ফেলব। তুমি ক্লাস করো না!' মোস্তফা পায়ের

> স্যান্ডেল

> তুলছে। (হারামজাদা, এইটা ওভারঅ্যাক্টিং হইতেছে। তুই খালি বাইরা, তোরে আজকা

> খাইছি।)

>

> স্যার ভীষণ বিব্রত। বললেন, 'না, না। আপনি শান্ত হোন। আপনার ছেলে তো টার্ম

> ফিও দেয়

> না!'

>

> 'টার্ম ফি দেয় না! হারামজাদা পড়াশোনা করে না, এইটার মানে বুঝলাম। কিন্তু

> টাকা তো

> আমি অরে নিয়মিত দেই। টার্ম ফি দেস নাই ক্যান, ওই …'

>

> আমি কাঁচুমাচু হয়ে বলি, 'খরচ আছে না!'

>

> মোস্তফা আমার কান ধরে বসে। (হারামজাদা বাইরে আয়। তোর কান যদি আমি টেনে

> লম্বা না

> করছি!)

>

> এই সময় স্যারের কাছে ফোন আসে। স্যার ধরেন, 'হ্যালো। জি, জামান সাহেব, একটু

> ব্যস্ত।

> আপনার প্রিয় ছাত্রকে নিয়েই বসেছি। আসবেন? আসেন।'

>

> জামান সাহেব আসছেন। স্যার ফোন রেখে মোস্তফার দিকে তাকিয়ে বলেন, 'আপনার

> সঙ্গে নাকি

> জামান সাহেবের পরিচয় আছে। আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যই আসছেন।'

>

> আমি প্রমাদ গুনি। মোস্তফার সঙ্গে জামান স্যারের পরিচয় আছে, নাকি আব্বার

> সাথে! দুটোই

> সমান বিপদ ডেকে আনবে।

>

> 'স্যার, আমরা আসি। আব্বার কাজ আছে। আব্বা, তোমার না কাজ?'

>

> মোস্তফাটা একটা গাধা। বলে, 'না তো, কাজ আবার কী। তোরটা এস্পার-ওস্পার না

> কইরা

> ছাড়তেছি না। প্রফেসর সাব, আমার ছেলেরে আপনার হাতে তুইলা দিলাম, আপনি

> মারেন-কাটেন,

> খালি নামটা কাইটেন না।'

>

> ততক্ষণে জামান স্যার এসে হাজির। 'কই, হাশেম সাহেব কই?'

>

> 'এই যে হাশেম সাহেব।'

>

> জামান স্যার বলেন, 'উনি তো হাশেম সাহেব নন!'

>

> আমি বলি, 'স্যার। ইনিই হাশেম সাহেব। আমার আব্বা।'

>

> জামান স্যার বলেন, 'তোমার আব্বাকে আমি খুব ভালো করে চিনি। তার সঙ্গে আমি

> একসঙ্গে

> মালয়েশিয়া গিয়েছিলাম।'

>

> আমি বলি, 'স্যার, আমার আব্বাকে আপনি কী করে চিনবেন! হাশেম সাহেব নামে তো কত

> লোকই

> আছে ঢাকায়। আর তার ছেলের নাম হাসনাত হতেই পারে।'

>

> 'কিন্তু তোমার আব্বা সঙ্গে যে মুভি ক্যামেরাটা নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে

> তোমাদের

> পারিবারিক ভিডিও অনেক দেখেছি। হাসনাহেনা তোমার বোন তো? তার সঙ্গে আমার

> ছেলের বিয়ের

> কথাও অনেক দূর এগিয়েছে।' (ইস, আমি ফ্যামিলির খবর কিছুই কেন রাখি নাই!)

>

> মোস্তফা উঠে পড়েছে। সে কি পালাতে চায়!

>

> আমি ছাড়ার পাত্র না। খড়কুটো আটকে ধরার মতো করে বলি, 'না, হাসনাহেনা বলে

> আমার কোনো

> বোন নাই। আপনি, স্যার, ভুল করছেন।'

>

> স্যার বলেন, 'হাশেম সাহেব, আপনার স্ত্রীর নামটা বলুন তো। আমাদের ফরমে ছেলের

> পিতা-মাতা

> দুটো নামই লিখতে হয়। আমার সামনে কম্পিউটারের পর্দায় ওর বাবা-মা সব নামই

> আছে। নিজের

> স্ত্রীর নাম বলতে পারেন না?'

>

> আমি বলি, 'গুলশানারা। আব্বা বলো। আব্বাদের আমলে স্বামীর নাম, স্ত্রীর নাম

> মুখে আনতে

> মানা ছিল।'

>

> মোস্তফা কামাল ধপাস করে পড়ে যায়। চোখ থেকে তার চশমা ছিটকে পড়ে। এই

> হারামজাদার

> আরেকটা সমস্যা আছে। সে চশমা ছাড়া দেখতে পায় না।

>

> আমি দিলাম এক দৌড়। থাক হারামজাদা, অভিনয় পারিস না, স্ক্রিপ্ট মুখস্থ নাই,

> তোর ঠেলা

> তুই সামলা!

>

> এবার আরেকজনকে আব্বা বানাতে হবে। তার আগে জামান স্যারকে সরাতে হবে অকুস্থল

> থেকে।

> আমার বোন হাসনাহেনাই সেটা পারবে। আমি বলি, 'আপুসোনা, একটা কাজ করে দাও না।

> তোমার

> হবু শ্বশুর জামান স্যারকে একটু এনগেজড রাখো।'

>

> ব্যবস্থা পাকা। জামান স্যার এখন গেছেন ইউনাইটেড হাসপাতালে পুরো শরীর চেকআপ

> করাতে।

> হাসনাহেনা দাঁড়িয়ে থেকে নিজে থেকে তাঁকে সবগুলো টেস্ট করাচ্ছে।

>

> এবার আমাদের বন্ধুর মামা নাট্যশিল্পী মশিউল আলম গেছেন আমার আব্বা সেজে।

> মশিউল বললেন,

> “জামান সাহেবের কাছে আমি সব শুনেছি। আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। গুলশানারাও তো

> লজ্জায়

> মুখ দেখাতে পারছে না। বলছে, 'তোমার কী ছেলে পেটে ধরেছি।' এই হাসনাত, আর

> কোনো দিন এই

> রকম করবি?”

>

> আমি বললাম, 'না আব্বা। আরও? যা শিক্ষা হবার হয়ে গেছে।'

>

> 'মনে থাকে যেন …'

>

> বলার সঙ্গে সঙ্গে আমার অরিজিনাল আব্বা হাশেম সাহেব ও আমার অরিজিনাল আম্মা

> গুলশানারা

> পাশের ঘর থেকে এসে উঁকি দিলেন। স্যার নিজেই ফোন করে তাদের আগে থেকে ডেকে

> এনে পাশের

> রুমে বসিয়ে রেখেছিলেন। আজকালকার টিচারগুলান এই রকম ফাজিল প্রকৃতির হয়ে

> থাকে! বলেন,

> এই দেশ কীভাবে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করবে, যদি শিক্ষক ও অভিভাবকেরা ছাত্রদের

> সহযোগিতা না করে?

>

> মশিউল টের পায়নি, বলেই চলেছে, 'ওর মা তো সারা দিনরাত কাঁদছে। নকল আব্বা

> বানিয়েছে

> ছেলে …।'

>

> কান্নার শব্দ উঠল। আমি তাকিয়ে দেখলাম আমার সত্যিকারের আম্মার চোখে

> সত্যিকারের জল।

>

> {গল্প টি প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যা (ঈদ-উল-ফিতর 2009) থেকে সংগৃহীত}

>

> ভাল লাগলে কমেন্টাইয়েন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s